Loading...

Blog Head Ads

কাদের খান ও তার বম্বে ইন্ডাস্ট্রিতে রাজত্ব | Kader Khan Short Bio

কাদের খান, Kader Khan

আমাদের সবার প্রিয় ও পরিচিত কিংবদন্তি কাদের খানের (Kader Khan) জন্ম ১৯৩৭ সালে আফগানিস্তানের কাবুলে। তার বাবা আব্দুল রহমান খান ছিলেন কান্দাহারের, আর তার মা ইকবাল বেগম ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পিশিনের। মোট চার ভাই ও বাবা-মা নিয়ে ছিল তাদের সুন্দর পরিবার। শৈশবে পাকিস্তানের একটি মিউনিসিপাল স্কুলে পড়েছেন তিনি। এরপর চলে আসেন মুম্বাইয়ের কামাথিপুরায়। সেখানে ইসমাইল ইউসুফ কলেজে পড়ার পর তিনি ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি এম এইচ সাবু সিদ্দিক কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে অধ্যাপনা করেন।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো একটি কঠিন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে সেই বিষয়েই অধ্যাপনা শুরু করলেন তিনি। অধ্যাপনা করলেও কাদের খানের প্রথম প্রেম হিসেবে তার মনে সবসময়ই ছিল অভিনয়। থিয়েটারের মস্ত বড় ভক্ত ছিলেন তিনি। কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পড়াশোনা পড়ালেও, তার নিজের মন পড়ে থাকতো সবসময় থিয়েটারেরি দিকে।
একবার থিয়েটারে তাস কি পাতে নামক একটি নাটকে অভিনয় করছিলেন তিনি। সেখানে তিনি নজরে পড়ে যান কমেডিয়ান আঘার। আঘা গিয়ে তার নাম করেন দিলীপ কুমারের কাছে। বলেন, "পারলে একবার দেখে আসুন এই ছেলের অভিনয়।" সত্যি সত্যিই নাটকে তার অভিনয় দেখতে হাজির হন দিলীপ কুমার, এবং এতটাই মুগ্ধ হন যে নিজের পরবর্তী দুই ছবি সাগিনা ও বৈরাগ-এর জন্য সাইন করিয়ে ফেলেন তাকে।


Kader-Khan-Famour-Movie-Image

কিংবদন্তি কাদের খান অভিনয়ের পাশাপাশি থিয়েটারে নাটকের চিত্রনাট্যও লিখতেন এবং তার সর্বপ্রথম চিত্রনাট্য ছিল, নরেন্দ্র বেদীর জাওয়ানি দিওয়ানি এবং এর মাধ্যমেই চিত্রনাট্যকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে তার। রোজ মুভিজের প্রযোজন রমেশ বেহল তার কাছে একটি ছবির চিত্রনাট্য লেখানোর জন্য আসেন এবং মাত্র চার ঘন্টায় চিত্রনাট্য লিখে ফেলেন তিনি, আর এর তিনদিনের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় সেই ছবির শ্যুটিং! নিঃসন্দেহে চিত্রনাট্য লিখনে এটি একটি রেকর্ড।

কাদের খানের কথা বলার ধরন ছিল খুবই বুদ্ধিদীপ্ত, ব্যাঙ্গাত্মক ও নাটকীয়। এবং এই তিনের সংমিশ্রণেই তিনি নিজের একটি সিগনেচার স্টাইল তৈরি করে নিয়েছিলেন। চলিত রীতির সংলাপ ও কথায় কথায় প্রবাদ বাক্যের ব্যবহার তাকে অনন্য করে তুলেছিল। তার এই দিকটি নির্মাতা মনমোহন দেশাইকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল। তার মুখে রোটি ছবির চিত্রনাট্যের বর্ণনা শুনে দেশাই এতটাই বিমোহিত হয়েছিলেন যে, তাকে একটি প্যানাসোনিক টিভি, একটি সোনার ব্রেসলেট আর নগদ ২৫,০০০ রুপি উপহার দিয়েছিলেন।

Kader-Khan-Famour-Muslim-Acting-Movie-Image

সেলিম-জাভেদের মতো সেই সময়ের তারকার খাতায় নাম লিখিয়ে ছিলেন কাদের খান। পাশাপাশি তিনি সেই বিরলতম ব্যক্তিত্বদের একজন, যিনি একই সাথে বলিউডের প্রধান দুই ক্যাম্প, দেশাইয়ের একটি ও প্রকাশ মেহরার অপরটি, এই দুইয়ের সাথেই সবসময় সদ্ভাব বজায় রেখে কাজ করে যেতে পেরেছিলেন। একদিকে দেশাইয়ের সাথে যেমন তিনি অমর আকবর অ্যান্থনি, ধারাম বীর ও কুলির মতো ছবিতে কাজ করেছেন, তেমনি মেহরার সাথে মুকাদ্দার কা সিকান্দার, লাওয়ারিস ও শারাবির মতো ছবিতেও কাজ করেছেন। তবে তিনি কেবল এই দুই ক্যাম্পের মাঝেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। দক্ষিণী প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ও নির্মাতারা যখন বিখ্যাত দক্ষিণী ছবির হিন্দি রিমেক তৈরির জন্য বম্বেতে এসে ভিড় জমাতে লাগলেন, তাদেরও প্রথম পছন্দ ছিলেন কাদের খানই। হিম্মতওয়ালা, জাস্টিস চৌধুরী, মাওয়ালি, তোহফা, হাইসিয়াত, নায়া কাদাম, সিংহাসনের মত ছবির সংলাপ ও চিত্রনাট্য সৃষ্টি হয়েছিল তার হাত ধরেই। তিনি কেবল দক্ষিণী ছবিগুলোকে হিন্দিতে অনুবাদ করেই ছেড়ে দেননি, বরং সেগুলোকে বম্বের উপযোগী রূপে রূপান্তরেও সফল হয়েছিলেন।

বলিউড ইন্ডাস্ট্রি কাদের খানকে কম দেয়নি। বিভিন্ন ছবি ও বিজ্ঞাপনে অভিনয় করে তিনি আয় করেছিলেন মোট ৬৯.৮ কোটি রুপি। লেখক হিসেবে তো তিনি অসম্ভব সফল ছিলেনই, পাশাপাশি ক্যারিয়ারের শেষ সায়াহ্নে এসে অভিনেতা হিসেবেও তার আকস্মিক জনপ্রিয়তা তাক লাগিয়ে দেবার মতোই। কিন্তু তারপরও, শেষ দিকে তিনি একদমই সন্তুষ্ট ছিলেন না। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের মানসিকতার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না তিনি। তার মতে, নতুনদের সাথে তার চিন্তাভাবনা ও অনুভূতির জায়গায় বিশাল একটি ফারাক তৈরী হয়ে গিয়েছিল। "ওদের চিন্তাভাবনা ছিল সব বাইরে থেকে আমদানি করা। কিন্তু আমি এই মাটির সন্তান, আমার অস্তিত্ব ছিল কামাথিপুরার সাথে সম্পৃক্ত," এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন তিনি।

তাই যখন কাদের খান দেখলেন চলচ্চিত্রের তারা ঝলমলে জগতের সাথে আর মানিয়ে নিতে পারছেন না তিনি, তখন বলিউডকে বিদায় বলে দেন তিনি। ১৯৭২ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল তার ক্যারিয়ার। এরপর তিনি আবারও ফিরে আসেন শিক্ষকতা পেশায়।

২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি টরন্টোর মিডোভেল কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন কাদের খান। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেছেন তিন ছেলে। কাদের খান  তার ছেলের সাথে শেষ কয়েক বছর ধরে চিকিৎসার জন্য টরন্টোতে বাস করছিলেন। পেয়েছিলেন কানাডার নাগরিকত্বও। তার ছেলে সরফরাজের মতে, মৃত্যুর আগে তিনি প্রচন্ড শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। তবু টরন্টোতে তিনি সম্ভাব্য সেরা চিকিৎসাই পেয়েছেন, এবং হাসিমুখেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

ভারতীয় চলচ্চিত্রে কাদের খানের অবদান অপরিসীম। আর তাই তার বিদায়ে যে শূন্যতা তৈরি হলো, সেটিও অপূরণীয়। তবে কাদের খান তার লেখা ছবির সংলাপ ও অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকমনে যে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন, সেই মুগ্ধতার রেশ থেকে যাবে অনন্তকালে জন্য এবং তিনি নিজের সৃষ্টিকর্মের মাঝেই আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন চিরকাল।

No comments:

Powered by Blogger.